ইআরএফের সেমিনারে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান

বিনিয়োগ বাড়াতে ২১ সমস্যা চিহ্নিত তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে সমাধান

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেছেন, বিভিন্ন ব্যবসায়ী মহলের কাছে তাদের সমস্যা জানতে চেয়েছিলাম।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেছেন, বিভিন্ন ব্যবসায়ী মহলের কাছে তাদের সমস্যা জানতে চেয়েছিলাম। সেখান থেকে ২১টি সমস্যা চিহ্নিত করেছি, যা তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে সমাধানের চেষ্টা করছি। আমাদের এনার্জি ও গ্যাসের সমস্যা সমাধানে কাজ করতে হবে। আমরা ১০০টি ইকোনমিক জোন না করে পাঁচটিতে ভালোভাবে ফোকাস করতে চাচ্ছি, যেন সেখানে সব ধরনের ইউটিলিটি দেয়া যায়।’

রাজধানীর পল্টনে গতকাল ‘বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি। অর্থনৈতিক বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) এ সেমিনারের আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালা। বিশেষ অতিথি ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ ও বর্তমান প্রশাসক হাফিজুর রহমান, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের সিইও মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী। ইআরএফের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমের সঞ্চালনায় সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন ইআরএফ সভাপতি।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিডার ব্যবসায়িক উন্নয়ন প্রধান নাহিয়ান রহমান রোচি। তিনি বলেন, ‘এফডিআই আকর্ষণে হিটম্যাপ নামে একটা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে ২০টি প্রতিষ্ঠানের মতামত নেয়া হয়েছে। এর ভিত্তিতে ১৯টি অগ্রাধিকার খাত নির্বাচন করা হয়েছে। হিটম্যাপ অনুযায়ী এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোগ নেয়া হবে।’

সেমিনারে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানান, আগামী ৭ থেকে ১০ এপ্রিল বিডা একটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করবে। তিনি বলেন, ‘এ সময় আমরা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভিজিট করব, যেন তারা বুঝতে পারেন কোথায় বিনিয়োগ করা উচিত। তারা স্বচক্ষে দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন যে কোন ইকোনমিক জোন তার বিনিয়োগের জন্য ভালো হবে।’

বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, ৯-১০ এপ্রিল আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনের মূল অনুষ্ঠান প্রধান অতিথি হিসেবে উদ্বোধন করবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস। তিনি বলেন, ‘আমাদের যে ১৯টি সম্ভাবনাময় খাত রয়েছে তার মধ্যে যে নয়টি বেশি সম্ভাবনাময় তা নিয়ে কাজ করব। একই সঙ্গে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি স্টার্টআপ সামিট হবে। এছাড়া দেশের বৃহৎ উদ্যোক্তাদের আমরা স্বীকৃতি দেব।’

বিনিয়োগকারীদের জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় এনগেজমেন্ট সহজ করতে বিডা কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে এক-দুই বছরের জন্য ফেলোশিপের মতো রিলেশনশিপ ম্যানেজার নিয়োগ দেয়ার চেষ্টা করছি। যারা এ সময় সরকারের জন্য কাজ করবেন, পরবর্তী সময়ে আবার নিজস্ব কর্মস্থলে যোগ দেবেন। আমরা ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন এজেন্সি (ইপিএ) কমানোর জন্য কাজ করছি। অনেকগুলো ইপিএ থাকলে বিনিয়োগকারীরা কনফিউজড হয়ে যান, কোথায় যোগাযোগ করবেন। এজন্য সবক’টি ইপিএকে এক জায়গায় আনার চেষ্টা করছি।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ নতুন করে গ্যাসের দাম ও ভ্যাট-ট্যাক্স বৃদ্ধির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘সরকার যে নীতি নিচ্ছে এগুলো বাস্তবায়িত হলে আমরা কোথায় যাব? গ্যাসের দাম ও ভ্যাট বৃদ্ধির আগে অর্থনীতি ও জনজীবনে এর কী প্রভাব পড়বে তা খতিয়ে দেখা হয়নি। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এ নিয়ে কোনো আলোচনাও করা হয়নি।’

পণ্য আমদানি-রফতানি ও মূলধনি যন্ত্রের আমদানি কমেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ চিত্র বলছে, বিনিয়োগ কমেছে। অর্থনীতির এ পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম ও ভ্যাট বৃদ্ধির প্রভাব কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে তা চিন্তা করা উচিত।’

এ কে আজাদ বলেন, ‘ব্যবসায়ী মানেই যেন অপরাধী। সবাই চুষে খেতে চায়। অনিয়মে অন্তত ৪০ শতাংশের মতো ব্যয় করতে হচ্ছে। আসলে সব সরকারের চরিত্রই এক। গত সরকার বলেছিল গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন করবে। কিন্তু তারা সেই প্রতিশ্রুতি রাখেনি। ’

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের একটা কমন প্রশ্ন থাকে, বাংলাদেশে ট্যাক্স রেটটা আসলে কত। কেউ বলে ২৭ শতাংশ, কেউ বলে ৩৬ শতাংশ, কেউ বলে ৪৮ শতাংশ, কেউ বলে ১২ শতাংশ। কোনো বেঞ্চমার্ক নেই। কারণ এত স্টেজে বিভিন্ন ধরনের ট্যাক্সরেট অ্যাপ্লাই হচ্ছে যে এফেক্টিভ ট্যাক্সরেটের বেসিক কোনো স্ট্রাকচার নেই। এটা হচ্ছে বিনিয়োগের প্রথম বাধা। তার সঙ্গে আছে অসংগত নীতি। সংবিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রক আদেশ (এসআরও) দিয়ে পলিসি চেঞ্জ করে দেয়া হচ্ছে। এ রকম অনিশ্চয়তার মধ্যে একজন বিনিয়োগকারী যখন বিনিয়োগ করেন তিনি তো দীর্ঘমেয়াদি একটা পরিকল্পনা নিয়ে আসেন। যেকোনো ক্ষেত্রে ইনসেনটিভ দিলে সেটা দীর্ঘমেয়াদি হতে হবে।’

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আরো বলেন, ‘স্পেশাল ইকোনমিক জোনের (এসইজেড) পলিসিতে প্রথমে বলা হয়েছিল তা প্রাইভেট সেক্টর ইনভেস্ট করবে। পরে আবার সরকার মিরসরাই করে কম্পিটিশন বাড়িয়ে দিল। সরকার যে লেভেলে এসইজেড দিতে পারবে বেসরকারি খাত সেই লেভেলে দিতে পারবে না। কারণ সরকারের সক্ষমতা আছে। আজ আমরা এসইজেডে ইনভেস্ট করে ধরা খেয়ে আছি।’

প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশনে বাংলাদেশে কোনো সময়সীমা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কোনো প্রজেক্ট শুরু হতেই অনেক বছর লেগে যায়। ফলে রিটার্ন অব ইনভেস্টমেন্ট মিলবে না। এরপর আছে এনবিআরের হয়রানি। যারা ভালো ট্যাক্স দিচ্ছে তাদের আবার দিচ্ছে। পরের বছর আবার অডিট করছে। এরপর আসে লজিস্টিক ডেফিসিট। সেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে একটা পণ্যের ওপর ড্যামারেজ দিয়ে, আরবিটারি ট্যাক্স বসিয়ে দিচ্ছে। ফলে যে দামে পণ্য আনছেন তার দাম দ্বিগুণ-তিন গুণ বেড়ে যাচ্ছে। কে দেখছে? কেউ দেখছে না। সরকার অনেক ব্যবসায় জড়িত। ডিরেগুলেশন দরকার।’

আরও